আজ শনিবার | ১৪ মার্চ ২০২৬

ফিতরায় দরিদ্রের অধিকার ও ঈদের আনন্দ

ফিতরায় দরিদ্রের অধিকার ও ঈদের আনন্দ

রমজান শুধু সিয়াম সাধনার মাস নয়; এটি মানবতার, সহমর্মিতার এবং সামাজিক সাম্যের এক অনন্য শিক্ষা। সারা মাস রোজা রেখে মানুষ যখন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে, তখন সে উপলব্ধি করতে শেখে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের বাস্তবতা। এই উপলব্ধিকেই বাস্তব রূপ দেয় ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সাদাকাতুল ফিতর।

ঈদের আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব।

 

এটি কেবল একটি দান নয়; বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রতি তাদের ন্যায্য অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাদের সম্পদে ছিল ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের নির্দিষ্ট অধিকার।’ (সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ১৯)

 

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের ধনী-সামর্থ্যবান মানুষের সম্পদের মধ্যেও দরিদ্র মানুষের অংশ রয়েছে। ফিতরা সেই অধিকারেরই একটি প্রকাশ।

 

রাসূলুল্লাহ (সা.) ফিতরার উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারের অপ্রয়োজনীয় কথা ও ভুলত্রুটি থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)

এই হাদিসে ফিতরার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, এটি রোজার ঘাটতিগুলো পূরণ করে এবং রোজাদারকে পরিশুদ্ধ করে।

দ্বিতীয়ত, এটি দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করে, যাতে ঈদের দিন তারাও আনন্দে অংশ নিতে পারে।

 

ভাবুন তো ঈদের সকাল। নতুন পোশাক পরে শিশুরা আনন্দে মেতে উঠেছে, ঘরে ঘরে রান্না হচ্ছে নানা সুস্বাদু খাবার। কিন্তু সমাজের কোনো এক কোণে হয়তো এমন একটি পরিবার আছে, যাদের ঘরে ঈদের দিনও তেমন কিছু নেই। ছোট্ট শিশুটি হয়তো নতুন জামার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু তার বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই।

 

এই বৈষম্য দূর করতেই ইসলাম ফিতরার বিধান দিয়েছে।

 

ফিতরা কেবল অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়; এটি মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। যখন আমরা ঈদের আগে ফিতরা আদায় করি, তখন আমরা নিশ্চিত করি যে সমাজের দরিদ্র মানুষও অন্তত একদিনের জন্য হলেও অভাবের কষ্ট ভুলে আনন্দ করতে পারে।

ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি শুধু ইবাদতের কথা বলে না—এটি মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। রমজানের পুরো মাস মানুষকে আত্মসংযম ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়, আর ঈদের আগে ফিতরা সেই শিক্ষাকে সমাজকল্যাণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে।

তাই আমাদের উচিত ফিতরাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দান হিসেবে না দেখা। বরং এটিকে দেখা উচিত দরিদ্র মানুষের অধিকার হিসেবে। একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে। যত দ্রুত সম্ভব ঈদের আগেই ফিতরা পৌঁছে দেওয়া দরকার, যাতে তারা সেই অর্থ বা খাদ্য দিয়ে ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারে।

অতএব, ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার মাঝে ভাগ হয়ে যায়। ফিতরার মাধ্যমে আমরা শুধু একজন দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাই না; বরং আমাদের সমাজকে আরও মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে তুলি।

রমজানের শেষে এই ছোট্ট দান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল নামাজ, রোজা বা তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধ জাগিয়ে তোলার মধ্যেই এর প্রকৃত মহিমা। আর সেই মহিমাই ঈদের আনন্দকে সত্যিকার অর্থে সবার জন্য আনন্দে পরিণত করে।

লেখক: শাব্বির আহমদ, শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।

পূর্ববর্তী খবর পড়ুন

কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬)

পরবর্তী খবর পড়ুন

জসীম উদ্‌দীন (১ জানুয়ারি ১৯০৩ - ১৩ মার্চ ১৯৭৬)