নিউইয়র্কের কুইন্সে এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী নিশাত জান্নাত। ছোট বোনের জন্য কেক হাতে বাড়ি ফেরার পথে তার জীবনের এই করুণ সমাপ্তি ঘটে।
ঘটনাটি ঘটে উডসাইড এলাকায়, রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ ও ৬২ স্ট্রিটের মোড়ে। রাত তখন প্রায় ১২টা। কাজ শেষে ট্রেন থেকে নেমে ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন নিশাত। ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমমুখী একটি গারবেজ ট্রাক ডান দিকে মোড় নিতে গিয়ে তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করে ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস (EMS)।
নিশাতের বাড়ি ছিল দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। কিন্তু সেদিন আর ঘরে ফেরা হলো না তার।
রাত বাড়ার সাথে সাথে পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বড় বোন নওশিন জান্নাত নিশাতকে ফোনে না পেয়ে গভীর চিন্তায় পড়েন। পরে মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা পুলিশ ও জরুরি বাহিনীর উপস্থিতি দেখতে পান। চারপাশে শোকাহত মানুষের ভিড় আর এক নিথর দেহ—সেটিই ছিল নিশাতের শেষ ঠিকানা।
নিশাত জান্নাত ছিলেন জ্যামাইকার একটি পার্কিং গ্যারেজে পার্ট-টাইম রিসেপশনিস্ট। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি ছোট বোনের জন্য কেক কিনে আনতে চেয়েছিলেন—সেই ইচ্ছাই তার শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়ায়।
তার পরিবার ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসে। বাবা হেলাল আহমদ উডসাইডের একটি মসজিদের ইমাম। পরিবারটি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রায়গড় গ্রাম থেকে এসেছে। আমেরিকায় একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আসা এই পরিবারের জন্য এই ঘটনা এক অপূরণীয় ক্ষতি।
নিশাত ছিলেন চার বোনের মধ্যে একজন। তার দুটি ছোট বোন রয়েছে, যাদের একজনের বয়স মাত্র ৯ বছর, আরেকজনের ৪ বছর। যে ছোট বোনের জন্য কেক নিয়ে ফিরছিলেন নিশাত, সে আর কখনো তার বড় বোনকে ফিরে পাবে না।
বড় বোন নওশিন জান্নাত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “নিশাত সবসময় বলত—আশা রাখো, বর্তমানেই বাঁচো। সে নিজেই জানত না তার সময় এত কম।”
ঘটনার তদন্ত করছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড। ট্রাকের চালক ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন এবং সামান্য আঘাতের চিকিৎসা নেন। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটস এলাকায় অনেকেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি গারবেজ ট্রাক চালকদের নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিশাতের জানাজা মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাকে নিউজার্সির একটি মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে নিভে গেল এক তরুণ প্রাণ—যে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি কাটাচ্ছিল তার ছোট বোনের জন্য কেক হাতে। তার শেষ কথা যেন আজও অনুরণিত হয়—“বর্তমানেই বাঁচো, এই মুহূর্তের জন্য বাঁচো।
বৈরাগীবাজার নিউজ ডেস্ক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.