প্রখর রোদে পুড়ে যাওয়া ধরণী যখন তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নামে বৃষ্টি—নির্মল, শান্ত ও স্নিগ্ধ এক রহমতের বার্তা নিয়ে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশ, যা শুকনো মাটিকে করে তোলে সজীব, ক্লান্ত প্রাণকে দেয় প্রশান্তি। শুধু প্রকৃতিই নয়, মানুষের মনেও বৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় এক অপার্থিব শান্তি ও আশার আলো। তাইতো পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে বৃষ্টির নানামুখী মুগ্ধকর বিবরণ এসেছে।
কোথাও বৃষ্টি বর্ষণকে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও কুদরতের নিদর্শন হিসেবে। কোথাও আল্লাহ তাআলার পরিচায়ক। আবার কোথাও রহমত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সে সত্তা, যিনি তারা নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং স্বীয় রহমতকে ছড়িয়ে দেন।
তিনিই অভিভাবক, প্রশংসিত।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ২৮)
আল্লাহ তাআলা বৃষ্টিকে তিনি নিজের রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেমন যেন আমাদের জীবন ও জীবন ধারণের সকল উপকরণ—সবই তাঁর রহমত। আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি স্বীয় রহমতের পূর্বে সুসংবাদস্বরূপ বাতাস প্রেরণ করেন।
’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৭)
তাই প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম যে কোনো বাতাসই হোক, বৃষ্টির পূর্বে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাশে মুহূর্তেই কড়া রোদ, উত্তপ্ত পরিবেশ, প্রচণ্ড গরম—সব যেন শীতল হয়ে যায়। মানুষ যখন একপ্রকার সেদ্ধ হতে থাকে, তখন একটুখানি শীতল বাতাশেরেই অপেক্ষায় থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর অন্যতম নিদর্শন- তিনি বাতাস পাঠান, যেন তা (বৃষ্টির) সুসংবাদ দিতে পারে এবং তিনি তোমাদের স্বীয় রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাতে পারেন।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৪৬)
এভাবে আল্লাহ তাআলা বরকতময় বৃষ্টি দিয়ে থাকেন, যাতে আছে প্রভূত কল্যাণ ও উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি বরকতপূর্ণ পানি, তারপর তার মাধ্যমে উদগত করি উদ্যানরাজি ও এমন শস্য, যা কাটা হয়ে থাকে।
এবং সৃষ্টি করি এমন উঁচু উঁচু খেজুর গাছ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ দানা। (এসব-ই) বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং (এমনিভাবে) আমি সেই পানি দিয়ে এক মৃত নগরকে সঞ্জীবিত করেছি। (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ৪৫) এ আয়াতে বৃষ্টির পানিকে আমাদের জন্য বরকত ও কল্যাণকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আকাশে জমে থাকা মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে আনার সক্ষমতা আমাদের নেই, সে বৃষ্টির পানি বড় কোনো জলাধারে সংরক্ষণ করে তা পান-উপযোগী করে রাখার মতো সক্ষমতাও নেই। আল্লাহ আমাদের জন্যে সহজ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাই বৃষ্টির পানি চলে যায় মাটির গভীরে। সেখান থেকে গভীর নলকূপ দিয়ে উঠে আসে পানি। এই যে বৃষ্টি বর্ষণ আর পানি সংরক্ষণ- এ একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষেই সম্ভব। তাই আল্লাহ বলেন, ‘আচ্ছা বলো তো, যে পানি তোমরা পান কর, মেঘ থেকে তা কি তোমরা বর্ষণ কর, না আমিই বর্ষণ করে থাকি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি, অতএব কেন তোমরা শোকর আদায় কোরো না?’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৮-৭০)
বৃষ্টির পানি দিয়ে আল্লাহ তাআলা ফল-ফসল উৎপন্ন করেন। সে হিসেবে বলা যায়, আমাদের রিজিক ও জীবনোপকরণ অনেকাংশেই এই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এরপর তা দিয়ে তোমাদের জীবিকাস্বরূপ বিভিন্ন প্রকার ফলমূল উৎপন্ন করেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২)
বৃষ্টি যেমন আমাদের উষ্ণতা দূর করে শীতলতার পরশ বুলিয়ে দেয়, তেমনি বৃষ্টির পানি আমাদের বাহ্যিক ও শারীরিক অপবিত্রতাও দূর করে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যেন তা দিয়ে তোমাদের তিনি পবিত্র করতে পারেন। (সুরা : আনফাল, আয়াত : ১১)
অতএব, বৃষ্টি কখনো শুধু পানি নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য দান, এক অফুরন্ত রহমত। তাই যখনই বৃষ্টি নামে, আমাদের উচিত তা কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। কেননা, বৃষ্টি যেমন মৃত মাটিকে জীবিত করে তোলে, তেমনি আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হয়ে শোকরিয়া আদায় করা আমাদের হৃদয়কে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
বৈরাগীবাজার নিউজ ডেস্ক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.