ছবি: সংগৃহীত
মহান রাব্বুল আলামিন পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। জমিনকে সমতল ও স্থির করে রেখেছেন এবং তার বুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য নিয়ামত। খাল-বিল, নদী-নালা, সমুদ্র, গাছপালা ও তরুলতা-সবই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। আল্লাহতায়ালার অগণিত নিয়ামতের মধ্যে কৃষি অন্যতম। এর মাধ্যমে তিনি মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। কৃষি ছাড়া মানবজীবন কল্পনা করা কঠিন। খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণ-সব ক্ষেত্রেই কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম।
ইসলাম কৃষিকে শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে নয়; বরং ইবাদত, মানবসেবা এবং আল্লাহর নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহারের একটি মহৎ কর্ম হিসাবে মূল্যায়ন করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা মানুষের খাদ্যের দিকে গভীরভাবে চিন্তা করতে বলেছেন-কীভাবে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করে জমিন থেকে শস্য, ফলমূল ও উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন। (সূরা আবাসা, ২৪-৩২)।
ইসলামে কৃষির গুরুত্ব : ইসলাম অলসতাকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং হালাল উপার্জনকে মর্যাদা দিয়েছে। কৃষি হালাল জীবিকা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। নবী করিম (সা.) কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলিম গাছ রোপণ করলে বা ফসল ফলালে তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী উপকৃত হলে তা তার জন্য সদকা হিসাবে গণ্য হয়। (সহিহ বুখারি, ২৩২০)।
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারও হাতে যদি একটি চারাগাছ থাকে এবং তা রোপণের সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে। (মুসনাদে আহমাদ)। এসব আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের খাদ্য উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ এবং প্রাণিকুলের কল্যাণে কাজ করা ইসলামে মর্যাদাপূর্ণ কর্ম।
কৃষির বহুমুখী উপকারিতা : কৃষির প্রথম ও প্রধান অবদান খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি, ফলমূল ও ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষি ছাড়া মানবজীবন কল্পনা করা কঠিন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। কৃষিকে কেন্দ্র করে পরিবহণ, সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণসহ অসংখ্য খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নেও কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃষিপণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি হয়। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।
কৃষি ও বৃক্ষরোপণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু মোকাবিলায় কৃষি ও বৃক্ষরোপণের ভূমিকা রয়েছে।
কৃষিকাজ মানুষের চরিত্র গঠনেও ভূমিকা রাখে। একজন কৃষক ধৈর্য, পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা ও আল্লাহর ওপর ভরসার বাস্তব শিক্ষা লাভ করেন। বীজ বপনের পর ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয় এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করে যেতে হয়। ফলে কৃষি মানুষের কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ গঠনে সহায়ক।
এ ছাড়া কৃষি ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সদকায়ে জারিয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী উৎপাদিত ফসল বা ফল থেকে উপকৃত হলে তা কৃষকের জন্য সদকা হিসাবে গণ্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কৃষকের মর্যাদা : ইসলাম কৃষির পাশাপাশি কৃষকের মর্যাদার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। কৃষক নিজের শ্রমে জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি সমাজের মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। তাই তার পেশা সম্মানের। একজন কৃষক যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালাল জীবিকার জন্য পরিশ্রম করেন এবং মানুষের খাদ্যের জোগান দেন, তখন তার শ্রম ইবাদতে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কৃষকের ঘামেই একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অথচ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। তাই কৃষকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ ও কৃষি : বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ মাঠ, সবুজ ধানের শীষ এবং কৃষকের জীবন এ দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা কৃষিপণ্য আমাদের খাদ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কৃষি শুধু খাদ্যের জোগান দেয় না; শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে কৃষিকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
কৃষিকে সহজসাধ্য করা জরুরি : কৃষি বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষক তাদের কঠোর শ্রম দিয়ে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেন এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। তাই কৃষিকে আরও সহজ, আধুনিক ও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
সূত্র: যুগান্তর
বৈরাগীবাজার নিউজ ডেস্ক
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.