আজ সোমবার | ০২ মার্চ ২০২৬

সিলেট মুক্ত দিবস আজ

সিলেট মুক্ত দিবস আজ

আজ ১৫ ডিসেম্বর, সিলেট মুক্ত দিবস। এই দিনটিতেই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন সিলেটের মানুষ। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটও ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও ঐক্যবদ্ধ।

ডিসেম্বরের শুরুতেই সিলেট শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ বোমা হামলা চলে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা, বিস্ফোরণের শব্দ আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল শহরবাসী। বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় আলী আমজাদের ঐতিহাসিক ঘড়ি, দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে কিন ব্রিজ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বহু স্থাপনা ও বসতভিটা।

১৩ ডিসেম্বর দুপুরে মুক্তিবাহিনীর একটি দল খাদিমনগর এলাকায় অবস্থান নেয়। একই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের আরও কয়েকটি দল পৌঁছে যায় জালালপুর ও পশ্চিম লামাকাজিতে। উত্তরের দিক ছাড়া শহরের প্রায় সব দিক থেকেই হানাদার বাহিনী তখন অবরুদ্ধ। উত্তরে পাহাড় ও বনাঞ্চল থাকায় সেদিক দিয়েও তাদের পালানোর সুযোগ ছিল সীমিত।

এই সময় এক অনন্য সাহসী উদ্যোগ নেয় মুক্তিবাহিনী। নাম না জানা দু’জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা খাদিমনগর থেকে একটি গাড়িতে মাইক লাগিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে জানাতে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করতে থাকেন। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই মাইকিং শহরের মানুষকে যেমন আবেগাপ্লুত করে, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝেও নতুন সাহস জাগিয়ে তোলে।

মাইকিং চলাকালে সেই গাড়ির পেছনেই আরেকটি গাড়িতে করে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের (১) বেসামরিক উপদেষ্টা ও তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক কর্নেল বাগচী। উদ্বিগ্ন কিন্তু আশাবাদী মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের যাত্রা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত অবস্থান ছিল সিলেট সরকারি কলেজ এলাকার আশপাশে।

আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে হানাদাররা প্রতিরোধ জোরদার করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদিমনগরের দিকে সরে যেতে হয়। ওই দিনই কদমতলী এলাকায় ঘটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ। একটি ইটখোলায় অবস্থান নেওয়া ২১ জন পাকিস্তানি সেনার ওপর আক্রমণ চালায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ একটি দল। প্রায় ৯ ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভারতীয় সুবেদার রানা সিং। তবে বিজয়ের মুহূর্তেই মাছিমপুর দিক থেকে নিক্ষিপ্ত একটি মর্টারের আঘাতে শহীদ হন সুবেদার রানা সিং। আহত হন মিত্রবাহিনীর আরও দুই সদস্য।

১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী সরকারি কলেজ এলাকা ছেড়ে সরে যেতে শুরু করে। ওই দিন দুপুরে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই দেওয়ান ফরিদ গাজী ও কর্নেল বাগচী শহর এবং বিমানবন্দরের পাশের শত্রুদের প্রধান ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকা ঘুরে দেখেন। একই সময় মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ‘জেড’ ফোর্সের সদস্যরা এমসি কলেজসংলগ্ন আলুরতলে সরকারি দুগ্ধ খামার এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয় পাকিস্তানি সেনাদের।

১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যোদ্ধারা দলে দলে শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। তাদের পদচারণা ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সিলেটের পাড়া-মহল্লা, অলিগলি।

পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকালে শহরে নামে মানুষের ঢল। বয়সভেদ নেই সবাই মুক্তির আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাস্তায় নেমে আসে। তখনো দুপুর গড়ায়নি। মাইকের ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে ‘সিলেট হানাদারমুক্ত, সিলেট হানাদারমুক্ত’। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে যায় ১৫ ডিসেম্বর সিলেট মুক্ত দিবস।

পূর্ববর্তী খবর পড়ুন

কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬)

পরবর্তী খবর পড়ুন

জসীম উদ্‌দীন (১ জানুয়ারি ১৯০৩ - ১৩ মার্চ ১৯৭৬)